ওজন কেন বাড়ে? স্থূলতার ( Obesity ) আসল কারণগুলো কি কি?
ওজন কেন বাড়ে? স্থূলতার আসল কারণগুলো জানতে পড়ুন এই পোস্টটি।
Health by GK
বর্তমান বিশ্বে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন একটি বড় স্বাস্থ্যসমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আগে যেখানে স্থূলতা উন্নত দেশের মানুষের মধ্যে বেশি দেখা যেত, বর্তমানে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও এটি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিশু থেকে শুরু করে তরুণ, মধ্যবয়স্ক এমনকি বৃদ্ধদের মধ্যেও অতিরিক্ত ওজনের সমস্যা বাড়ছে। আধুনিক জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া এবং মানসিক চাপ এর অন্যতম কারণ।
অনেকেই মনে করেন বেশি খাওয়ার কারণেই শুধু ওজন বাড়ে। বাস্তবে বিষয়টি আরও জটিল। শরীরের হরমোন, ঘুম, মানসিক অবস্থা, জেনেটিক বৈশিষ্ট্য এবং দৈনন্দিন অভ্যাসও ওজন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে হলে আগে জানতে হবে—ওজন কেন বাড়ে এবং স্থূলতার আসল কারণগুলো কী।
১.১ স্থূলতা কী?
স্থূলতা বা Obesity হলো শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমে এমন একটি অবস্থা, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। যখন শরীর প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্যালোরি গ্রহণ করে এবং সেই ক্যালোরি খরচ করতে পারে না, তখন অতিরিক্ত শক্তি শরীরে চর্বি হিসেবে জমা হতে থাকে। ধীরে ধীরে এই জমে থাকা চর্বি শরীরের ওজন বাড়িয়ে দেয়।
স্থূলতা শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নষ্ট করে না; এটি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ফ্যাটি লিভার, স্ট্রোক এবং কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা World Health Organization স্থূলতাকে একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
১.২ BMI ও শরীরের ওজন নির্ণয়
কোনো ব্যক্তি স্বাভাবিক ওজনের, অতিরিক্ত ওজনের নাকি স্থূল—তা নির্ণয়ের জন্য BMI বা Body Mass Index ব্যবহার করা হয়। এটি শরীরের ওজন ও উচ্চতার অনুপাতের মাধ্যমে হিসাব করা হয়।
BMI নির্ণয়ের সূত্র:
�BMI = Weight / Height
সাধারণত—
BMI ১৮.৫-এর নিচে হলে Underweight
১৮.৫–২৪.৯ হলে স্বাভাবিক
২৫–২৯.৯ হলে Overweight
৩০ বা তার বেশি হলে Obesity ধরা হয়
তবে শুধু BMI দিয়েই সবসময় সঠিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বোঝা যায় না। কারণ কারও শরীরে পেশি বেশি থাকলেও BMI বেশি হতে পারে। তাই কোমরের মাপ, শরীরের চর্বির পরিমাণ এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
১.৩ অতিরিক্ত ক্যালোরির প্রভাব
ওজন বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ হলো অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ। শরীর প্রতিদিন খাবার থেকে শক্তি বা ক্যালোরি পায়। এই শক্তি হাঁটা, কাজ করা, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং শরীরের অন্যান্য কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্যালোরি গ্রহণ করলে অতিরিক্ত অংশ চর্বি হিসেবে জমা হয়।
উদাহরণস্বরূপ, নিয়মিত অতিরিক্ত ভাত, ফাস্ট ফুড, মিষ্টি বা কোমল পানীয় খেলে শরীরে ক্যালোরি জমতে থাকে। অনেক সময় মানুষ বুঝতেই পারে না যে তারা দৈনিক প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি ক্যালোরি গ্রহণ করছে।
বর্তমানে বড় সমস্যা হলো “Liquid Calories” অর্থাৎ কোমল পানীয়, এনার্জি ড্রিংক বা অতিরিক্ত চিনি মিশ্রিত পানীয়। এগুলো দ্রুত ক্যালোরি বাড়ায় কিন্তু পেট ভরার অনুভূতি কম দেয়।
১.৪ জাঙ্ক ফুড ও প্রসেসড খাবার
আধুনিক খাদ্যাভ্যাস ওজন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বার্গার, পিজ্জা, ফ্রাইড চিকেন, চিপস, কেক, আইসক্রিম, কোমল পানীয় ইত্যাদি খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বি থাকে। এগুলোকে সাধারণত Junk Food বা Processed Food বলা হয়।
এই খাবারগুলোর কয়েকটি বড় সমস্যা হলো—
অতিরিক্ত ক্যালোরি
কম পুষ্টিগুণ
ক্ষুধা দ্রুত বাড়ানো
শরীরে চর্বি জমা করা
প্রসেসড খাবারে থাকা Trans Fat হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়ায়। এছাড়া অতিরিক্ত চিনি ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আজকাল ব্যস্ত জীবনে মানুষ সহজলভ্য ও সুস্বাদু খাবারের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে। ফলে ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যকর খাবারের পরিবর্তে ফাস্ট ফুডের ব্যবহার বাড়ছে, যা স্থূলতার অন্যতম কারণ।
১.৫ শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ার প্রভাব
আগের তুলনায় বর্তমানে মানুষের দৈনন্দিন শারীরিক পরিশ্রম অনেক কমে গেছে। প্রযুক্তিনির্ভর জীবন মানুষকে আরও অলস করে তুলেছে। অফিসে দীর্ঘসময় বসে কাজ করা, মোবাইল ও কম্পিউটার ব্যবহার, লিফট ব্যবহার এবং কম হাঁটা—এসব কারণে শরীর কম ক্যালোরি খরচ করে।
যখন ক্যালোরি গ্রহণ বেশি হয় কিন্তু খরচ কম হয়, তখন শরীরে চর্বি জমা হতে থাকে। বিশেষ করে দীর্ঘসময় বসে থাকার কারণে পেটের মেদ দ্রুত বাড়ে।
বর্তমানে শিশুদের মধ্যেও স্থূলতা বাড়ছে কারণ তারা মাঠে খেলাধুলা কম করে এবং মোবাইল বা ভিডিও গেমে বেশি সময় ব্যয় করে। নিয়মিত হাঁটা, ব্যায়াম ও শারীরিক পরিশ্রম না থাকলে ওজন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
১.৬ ঘুমের অভাব ও ওজন বৃদ্ধি
অনেকেই মনে করেন ঘুমের সঙ্গে ওজন বৃদ্ধির কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং ক্ষুধা বেড়ে যায়।
কম ঘুমালে শরীরে Ghrelin নামক ক্ষুধা বাড়ানো হরমোন বৃদ্ধি পায় এবং Leptin নামক তৃপ্তির হরমোন কমে যায়। ফলে মানুষ বেশি খেতে শুরু করে।
এছাড়া রাত জেগে থাকলে অনেকেই অতিরিক্ত নাস্তা বা জাঙ্ক ফুড খেয়ে থাকে। এতে ক্যালোরি আরও বাড়ে। দীর্ঘদিন অনিয়মিত ঘুম Metabolism ধীর করে দেয়, ফলে শরীর সহজে চর্বি জমাতে শুরু করে।
বিশেষজ্ঞরা সাধারণত প্রতিদিন ৭–৮ ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেন।
১.৭ মানসিক চাপ ও Emotional Eating
মানসিক চাপ বা Stress বর্তমানে ওজন বৃদ্ধির একটি বড় কারণ। অনেক মানুষ দুশ্চিন্তা, হতাশা বা মানসিক কষ্টের সময় অতিরিক্ত খাওয়া শুরু করে। একে Emotional Eating বলা হয়।
Stress হলে শরীরে Cortisol নামক হরমোন বৃদ্ধি পায়, যা ক্ষুধা বাড়িয়ে দেয়। তখন মানুষ সাধারণত মিষ্টি, চকলেট, ফাস্ট ফুড বা উচ্চ ক্যালোরিযুক্ত খাবারের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়।
অনেক সময় মানুষ বুঝতেই পারে না যে তারা ক্ষুধার কারণে নয়, বরং মানসিক অস্থিরতার কারণে খাচ্ছে। ফলে অজান্তেই অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ হয়।
ধ্যান, ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক প্রশান্তি Emotional Eating কমাতে সাহায্য করতে পারে।
১.৮ হরমোনজনিত কারণ
শরীরের বিভিন্ন হরমোন ওজন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোনো কারণে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে দ্রুত ওজন বাড়তে পারে।
বিশেষ করে—
Hypothyroidism
PCOS
Insulin Resistance
Cushing Syndrome
ইত্যাদি সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ওজন সহজে বাড়ে।
নারীদের ক্ষেত্রে PCOS-এর কারণে হরমোন পরিবর্তন হয় এবং পেটের মেদ বৃদ্ধি পায়। আবার থাইরয়েড হরমোন কমে গেলে Metabolism ধীর হয়ে যায়, ফলে শরীর কম ক্যালোরি পোড়ায়।
তাই অনেক সময় শুধু ডায়েট করেও ওজন কমানো কঠিন হয়ে পড়ে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হয়।
১.৯ জেনেটিক কারণ
কিছু মানুষের শরীরে জেনেটিকভাবে ওজন বৃদ্ধির প্রবণতা বেশি থাকে। পরিবারে বাবা-মা স্থূল হলে সন্তানদের মধ্যেও স্থূলতার ঝুঁকি বেশি দেখা যায়।
তবে জেনেটিক কারণ থাকলেও সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। জিন মানুষের প্রবণতা বাড়াতে পারে, কিন্তু জীবনযাপনই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১.১০ স্থূলতার স্বাস্থ্যঝুঁকি
স্থূলতা শুধু ওজন বৃদ্ধি নয়; এটি নানা মারাত্মক রোগের কারণ হতে পারে। অতিরিক্ত চর্বি শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে এবং বিভিন্ন অঙ্গের উপর চাপ সৃষ্টি করে।
স্থূলতার কারণে যেসব সমস্যা হতে পারে—
টাইপ–২ ডায়াবেটিস
উচ্চ রক্তচাপ
হৃদরোগ
স্ট্রোক
ফ্যাটি লিভার
শ্বাসকষ্ট
ঘুমের সমস্যা
জয়েন্টে ব্যথা
মানসিক হতাশা
পেটের অতিরিক্ত মেদ বিশেষভাবে বিপজ্জনক কারণ এটি হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়।
উপসংহার
ওজন বৃদ্ধি একটি ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া সমস্যা, যার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। অতিরিক্ত ক্যালোরি, জাঙ্ক ফুড, অলস জীবনযাপন, কম ঘুম, মানসিক চাপ, হরমোনের সমস্যা এবং জেনেটিক বৈশিষ্ট্য—সবকিছু মিলেই স্থূলতার সৃষ্টি হয়।
তবে সুখবর হলো, সচেতন জীবনযাপন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখার মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ওজন কমানোর যাত্রা কোনো অস্থায়ী ডায়েট নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যকর জীবনধারার অংশ।
পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা জানব—স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন কমানোর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কী এবং কীভাবে নিরাপদ উপায়ে ফিট থাকা যায়।

Comments